বর্তমানে চীন তার অর্থনীতিকে প্রথাগত উৎপাদন (Manufacturing) থেকে সরিয়ে ‘আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি’-তে রূপান্তর করার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ কাজ করছে:
১. শিল্পের আধিপত্য:
চীনের অর্থনীতি এখন দুইটি প্রধান খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) এবং সৌরশক্তি।
* EV বিপ্লব: ২০২৬ সালে এসে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০টি গাড়ির মধ্যে ৭টিই বৈদ্যুতিক। বিওয়াইডি (BYD) এবং শাওমি-র মতো কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে শীর্ষস্থান দখল করছে।
* সৌরশক্তি: চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল উৎপাদনকারী। তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের আগেই কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা, যা তাদের অর্থনীতিতে সবুজ বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
২. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও হিউম্যানয়েড রোবোটিক্স:
প্রযুক্তির লড়াইয়ে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমান্তরাল। বিশেষ করে 'জেনারেটিভ এআই' এবং শিল্প কারখানায় রোবটের ব্যবহারে চীন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
* রোবট কর্মী: চীনের দংগুয়ান এবং শেনজেন অঞ্চলের কারখানাগুলোতে এখন মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা বেশি। ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, দেশটি ১০ লক্ষ ‘হিউম্যানয়েড রোবট’ (মানুষের মতো দেখতে রোবট) সেবা খাতে নিয়োগ করতে যাচ্ছে।
* স্মার্ট সিটি: বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো শহরগুলোতে এআই-চালিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকবিহীন ট্যাক্সি (Robotaxi) এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
৩. সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ স্বনির্ভরতা:
পশ্চিমা দেশগুলোর চিপ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার মুখে চীন এখন নিজের ‘সিলিকন ভ্যালি’ তৈরিতে শতভাগ মনোযোগ দিয়েছে।
* SMIC এবং হুয়াওয়ে: এই দুই প্রতিষ্ঠান মিলে ৫ ন্যানোমিটার এবং এমনকি ২ ন্যানোমিটার চিপ তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে। এটি চীনের স্মার্টফোন এবং সামরিক প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
* বিনিয়োগ: সরকার ‘বিগ ফান্ড’ (Big Fund Phase III)-এর মাধ্যমে চিপ শিল্পে আরও ৩৪০ বিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
৪. আবাসন সংকট থেকে উত্তরণ ও অভ্যন্তরীণ খরচ বৃদ্ধি:
চীনের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের গলার কাঁটা ছিল ‘রিয়েল এস্টেট’ বা আবাসন খাত। তবে ২০২৬ সালে সরকার ‘তিন বছরের আবাসন সংস্কার পরিকল্পনা’ সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে।
* সরকারি হস্তক্ষেপ: বড় বড় আবাসন কোম্পানিগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে সরকার সরাসরি প্রকল্পগুলো কিনে নিয়ে স্বল্পমূল্যে নাগরিকদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে।
* অভ্যন্তরীণ ভোগ: রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন এখন নিজের দেশের ১৪০ কোটি মানুষের কেনাকাটার ক্ষমতা (Domestic Consumption) বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে।
৫. মহাকাশ অর্থনীতি (Space Economy):
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আরেকটি বড় জায়গা হলো মহাকাশ। চীন ২০২৬ সালে তাদের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন 'তিয়াংগং'-কে আরও বড় করার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক রকেট উৎক্ষেপণে চীন এখন প্রতি মাসে অন্তত ৩টি সফল মিশন পরিচালনা করছে, যা বৈশ্বিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারে ইলন মাস্কের 'স্টারলিংক'-কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
২০২৬ সালে চীনের অর্থনীতি আর কেবল সস্তা পণ্যের কারখানা নয়, বরং এটি এখন উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবক। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য (Aging Population) চীনের জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।