লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির বাড়ি সাতক্ষীরায়—এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে দুইটি গ্রাম, থমকে গেছে অসংখ্য স্বপ্ন, আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে অসহায় দুই পরিবারের আকাশ-বাতাস। নিহতরা হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২০)। জীবনের তীব্র দারিদ্র্য, সংসারের অভাব, ঋণের বোঝা আর পরিবারের মুখে একমুঠো হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়েই তারা পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। কিন্তু জীবনের যুদ্ধ জিততে গিয়ে তারা হার মানলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের নির্মম আগুনের কাছে।
সোমবার (১১ মে) লেবাননের নাবাতিহ জেলার জেবদিন এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান এই দুই বাংলাদেশি। মুহূর্তের বিস্ফোরণে থেমে যায় তাদের সমস্ত স্বপ্ন, শেষ হয়ে যায় পরিবারের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম। একই হামলায় আরও এক সিরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নিহত শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বৃদ্ধ বাবা আফসার আলী নির্বাক হয়ে উঠানে বসে আছেন, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না তার সন্তান আর কখনও ফিরে আসবে না। মা আজেয়া খাতুন বারবার ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন। স্বজনরা জানান, সংসারের অভাব-অনটন আর ধারদেনার চাপ মাথায় নিয়েই কয়েক বছর আগে বিদেশে যান শফিকুল। বাড়ির ভাঙা ঘর মেরামত করা, ছোট সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানো এবং এনজিওর ঋণ শোধ করাই ছিল তার একমাত্র স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন রক্তাক্ত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য স্থানীয় সমিতি ও এনজিও থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন শফিকুল। প্রতি মাসে কিস্তির চাপ, পরিবারের ব্যয় আর বিদেশের অনিশ্চিত জীবন তাকে সবসময় মানসিকভাবে ভেঙে রাখত। তারপরও পরিবারের সুখের কথা ভেবে নিজের কষ্ট কখনও প্রকাশ করতেন না। এখন তার মৃত্যুর পর ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে গেছে পুরো পরিবার।
অপরদিকে আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে মাতম। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই তরুণ পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। বাবা আব্দুল কাদের অসুস্থ, সংসারে উপার্জনের তেমন কেউ ছিল না। মায়ের চোখে ছিল ছেলেকে ঘিরে হাজারো স্বপ্ন। সেই ছেলে এখন কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরবে—এ কথা মানতে পারছেন না কেউই।
স্বজনদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানা যায়, বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বন্ধক রাখা হয়েছিল। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও ধার করা হয়েছিল টাকা। প্রতিদিন ফোনে নাহিদুল বলতেন, “আর একটু কষ্ট করেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু সেই ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ কথাটি আজ পরিবারের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধে আছে।
বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত এক শোকবার্তায় নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তারা নিজ আবাসস্থলে অবস্থানকালে ইসরায়েলি বিমান হামলার শিকার হন। বর্তমানে তাদের মরদেহ নাবাতিহের নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দুই পরিবারের স্বজনরা সরকারের কাছে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—অভাবের তাড়নায় বিদেশে গিয়ে যদি যুদ্ধের আগুনে জীবন দিতে হয়, তাহলে এই অসহায় পরিবারগুলোর কান্নার দায় কে নেবে?