সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ পরিশোধের পর সুন্দরবনের ভয়াল জলদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে ২০ জন জেলে ও মৌয়ালের মধ্যে ১৮ জন অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। সোমবার বিকেল পর্যন্ত ধাপে ধাপে তারা নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছালে স্বজনদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে এখনও দুই জেলে নিখোঁজ থাকায় তাদের পরিবারে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ফিরে আসা জেলে ও মৌয়ালদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ ও ৫ মে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি নদীর গোয়াল বুনিয়া দুনের মুখ, ধানোখালীর খাল, মামুন্দো নদীর মাধভাঙা খাল এবং মালঞ্চ নদীর চালতে বেড়ের খাল এলাকায় মাছ ও মধু সংগ্রহের সময় অস্ত্রধারী জলদস্যুরা তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণকারীরা নিজেদের “আলিফ ওরফে আলিম বাহিনী” এবং “নানাভাই/ডন বাহিনী” পরিচয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে গভীর বনের ভেতরে জিম্মি করে রাখে।
অপহরণের পর থেকেই শুরু হয় স্বজনদের আহাজারি আর উৎকণ্ঠার দীর্ঘ প্রহর। দস্যুরা মোবাইল ফোনে একের পর এক কল দিয়ে জেলে ও মৌয়ালদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট মহাজনদের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে। বনাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলো প্রিয়জনদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে ধারদেনা, জমি বন্ধক ও সুদের টাকার ব্যবস্থা করে মুক্তিপণ জোগাড় করতে বাধ্য হয়।
পরিবার ও মহাজনদের সঙ্গে দীর্ঘ দর-কষাকষির পর কিছু টাকা কমিয়ে নির্ধারিত বিকাশ নম্বরে মুক্তিপণের অর্থ পাঠানো হয়। পরে একে একে ১৮ জনকে মুক্তি দেয় দস্যুরা। দীর্ঘ নির্যাতন ও মৃত্যুভয়ের বিভীষিকা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলেও এখনও আতঙ্ক কাটেনি তাদের চোখেমুখে।
মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা জেলেদের মধ্যে রয়েছেন— মুরশিদ আলম (৭০ হাজার টাকা), করিম শেখ (১ লাখ ২০ হাজার), আবু ইসা (৫৫ হাজার), মমিন ফকির (৪৫ হাজার), আল-আমিন (২৫ হাজার), আবুল বাসার বাবু (৩০ হাজার), আবুল কালাম (৩০ হাজার), শাহাজান গাজী (৪০ হাজার), সিরাজ গাজী (৪০ হাজার), রবিউল ইসলাম বাবু (২০ হাজার), সঞ্জয় (২০ হাজার), আল-মামুন (২০ হাজার), হুমায়ুন (২০ হাজার), মনিরুল মোল্লা (২০ হাজার), রবিউল ইসলাম (২০ হাজার), হৃদয় মন্ডল (২০ হাজার), আব্দুল সালাম (৪০ হাজার) ও ইব্রাহিম গাজী (৫৫ হাজার টাকা)।
তবে শুকুর আলী গাজী ও রেজাউল করিম নামে আরও দুই জেলের পরিবারের দাবি, ৩০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ পাঠানো হলেও তারা এখনও বাড়ি ফেরেননি। এ কারণে তাদের পরিবারে কান্না আর উৎকণ্ঠা যেন থামছেই না। স্বজনরা আশঙ্কা করছেন, হয়তো নতুন করে আরও অর্থ দাবির ফাঁদে ফেলা হতে পারে অথবা তাদের ভাগ্যে অন্য কোনো অজানা বিপদ নেমে এসেছে।
পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ মশিউর রহমান বলেন, “জলদস্যু দমনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে অপহৃতদের পরিবার বা সহযোগীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় অভিযান পরিচালনায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।”
এদিকে মুক্তি পাওয়া জেলে ও তাদের পরিবার দ্রুত সুন্দরবনে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবনের নদী ও খালগুলোতে নিয়মিত টহল এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বারবার এমন অপহরণের ঘটনা ঘটছে। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে বনে যাওয়া জেলে ও মৌয়ালরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।