বিবেক এখনো বেঁচে আছে
আমি মেনে নেব না—
এই উত্তর-ঔপনিবেশিক মনন-যন্ত্রের সূক্ষ্ম কারসাজি,
যেখানে চেতনা ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত হয় শৃঙ্খলিত স্বয়ংক্রিয়তায়,
আর স্মৃতি—রাষ্ট্রীয় নকশার অধীনে—পরিণত হয় পরিকল্পিত বিস্মৃতির প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণাগারে।
আমি প্রত্যক্ষ করেছি—
সভ্যতার অলঙ্কৃত পরিকাঠামোর অন্তরালে কীভাবে সঞ্চিত হয় সুসংগঠিত নৈরাজ্যের স্থাপত্য;
গণতন্ত্রের প্রতীকি আবরণের গভীরে কীভাবে সক্রিয় থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যের সুপ্ত হিংস্রতা;
আর ব্যক্তিসত্তা কীভাবে প্রতিদিন নির্বাসিত হয় অদৃশ্য পর্যবেক্ষণের বায়বীয় কারাগারে।
ভাষা নিজেই এখন এক নিয়ন্ত্রিত জ্ঞান-সংস্থান—
যেখানে শব্দের নৈতিক বিন্যাস বিকৃত,
সত্য উচ্চারণ শাসনের বিধির বিরুদ্ধে এক অগ্রহণযোগ্য উচ্চারণ,
আর নীরবতা—সভ্য আনুগত্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
চিন্তা আর চিন্তা নয়—
সে এখন পূর্বনির্ধারিত প্রতিক্রিয়া,
মানবিক প্রশ্নের স্থলে প্রতিস্থাপিত অনুশাসিত সম্মতি,
যেখানে সন্দেহ নয়, আনুগত্যই জ্ঞানের চূড়ান্ত পরিণতি।
এ এক রক্তহীন জ্ঞান-বিনাশ—
যেখানে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যুক্তির ধারাবাহিকতা,
বিবেকের স্বায়ত্তশাসন,
এবং মানবিক অর্থ-সৃষ্টির ঐতিহাসিক ক্ষমতা।
সমগ্র পৃথিবী এখন এক বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ-স্থাপত্য—
যেখানে ক্ষমতা কেবল শাসনই করে না,
বরং পরিমাপ করে মানুষের অন্তর্গত স্পন্দনকেও।
মানুষ আর কেবল জৈব অস্তিত্ব নয়—
সে এখন তথ্য-সত্তা,
উপাত্তের পুনরাবৃত্ত প্রতিচ্ছবি,
ভোগ-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার এক ক্ষণস্থায়ী উপাদান।
তবু ইতিহাসের গভীরে সঞ্চিত থাকে এক অবদমিত অগ্নিসূত্র—
যাকে কোনো পরিসংখ্যান চিরদিন নির্বাপিত রাখতে পারে না।
কারণ সভ্যতা কখনোই ক্ষমতার স্থায়ী সম্পত্তি নয়;
সভ্যতা শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে মানুষের কাছেই—
নিপীড়িতের স্মৃতিতে,
অবদমিতের দীর্ঘশ্বাসে,
অস্বীকৃত মানুষের অনুচ্চারিত ভাষায়।
আমি সেই নীরব বহুসংখ্যকের ভাষা—
যাদের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নয়,
কিন্তু যাদের অনুপস্থিতিতেই ইতিহাসের সমস্ত স্থাপত্য ভেঙে পড়ে।
শুনে রেখো—
যখন অবদমিত অর্থ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হবে,
তখন শুধু প্রাসাদ নয়, ভাষার ব্যাকরণও ভেঙে যাবে;
এবং শব্দ ফিরে যাবে তার আদিম অগ্নিতে—
অর্থেরও পূর্ববর্তী এক প্রাচীন উৎসে।
মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়,
কিন্তু মানুষের অন্তর্গত পুনর্জাগরণকে নয়।
কারণ প্রতিরোধ কোনো সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়—
সে অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা অবশ্যম্ভাবী সত্য।
বাংলার মানুষের বিবেক এখনো বেঁচে আছে।
এখনো কিছু চোখ অন্যায়ের সামনে নত হতে শেখেনি।
এখনো কিছু কণ্ঠ সত্য উচ্চারণের দায় বহন করে।
এখনো কিছু মানুষ বিশ্বাস করে—
মানুষের মর্যাদা কোনো শাসনের দান নয়,
বরং জন্মগত অধিকার।
যতদিন সেই বিশ্বাস জীবিত থাকবে,
ততদিন ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হবে না।
কারণ সভ্যতার শেষ আশ্রয় কোনো প্রাসাদ নয়—
মানুষের জাগ্রত বিবেক।