মৃত্যুফাঁদে পরিণত কয়ারবিল সেতু: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পারাপার হাজারো মানুষের, দ্রুত পুনর্নির্মাণের জোর দাবি
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁশদাহা ইউনিয়নের কয়ারবিল এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, সেতুটি এখন আর কোনো সাধারণ সেতু নয়, এটি যেন একটি "মৃত্যুফাঁদ"। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রোগী ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা এই সেতু পারাপার করছেন। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কয়ারবিল সেতুর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে আছে। সেতুর পাটাতন, সংযোগ সড়ক এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভারী যানবাহনের চাপ এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেতুটির অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে সেতুর ক্ষতিগ্রস্ত অংশে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ, কাঠ, ইটের খোয়া, রাবিশ এবং মাটি ভরা বস্তা ফেলে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সেটিও এখন নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
দিনের বেলায় কোনো রকমে চলাচল করা গেলেও রাতের অন্ধকারে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক মোটরসাইকেল আরোহী, ইজিবাইক চালক এবং পথচারী সেতু পার হওয়ার সময় আতঙ্কে থাকেন। বৃষ্টির সময় কিংবা পিচ্ছিল অবস্থায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার, তবে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির বেহাল অবস্থার বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো কাজের অগ্রগতি নেই। ফলে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয়রা জানান, কয়ারবিল সেতুটি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সঙ্গে সীমান্তবর্তী কলারোয়া উপজেলার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহন এই পথ ব্যবহার করে। স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সেতুটির গুরুত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শত শত শিক্ষার্থী এই সেতু ব্যবহার করে যাতায়াত করে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন। সেতু পার হওয়ার সময় ছোট শিশু ও শিক্ষার্থীদের প্রায়ই ভয় ও আতঙ্কে থাকতে হয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও সেতুটির গুরুত্ব অপরিসীম। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকার অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সেতুর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেতুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে অনেক সময় জরুরি রোগী পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় পরিবারগুলোকে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়।
কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সেতুটির বেহাল অবস্থা। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধান, মাছ, সবজি, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক সময় ঝুঁকি এড়াতে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তারা বলেন, মালামাল পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভারী বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবল চাপে সেতুর অবশিষ্ট অংশও ধসে পড়তে পারে। যদি এমনটি ঘটে, তাহলে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও ব্যবসাসহ জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম পদক্ষেপ নেওয়াই প্রশাসনের দায়িত্ব। একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা শুধু অব্যবস্থাপনারই নয়, জননিরাপত্তার প্রতিও অবহেলার পরিচায়ক।
এলাকাবাসী অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুটি সংস্কার অথবা সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের একটাই প্রশ্ন— কোনো প্রাণহানি বা বড় দুর্ঘটনা ঘটার পর কি কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে, নাকি তার আগেই হাজারো মানুষের নিরাপদ চলাচলের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে?