
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো কোমলমতি শিক্ষার্থীর জন্য সরবরাহকৃত মিড-ডে মিল কর্মসূচির বনরুটিতে অগ্রিম উৎপাদন তারিখ ব্যবহারের অভিযোগে একটি খাবারবাহী গাড়ি জব্দ করেছে প্রশাসন ও পুলিশ। শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সরকারি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে এ ঘটনায় গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) রাত প্রায় ৮টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁকাল চেকপোস্ট এলাকায় স্থানীয়দের সন্দেহের ভিত্তিতে বনরুটি বোঝাই একটি গাড়ি আটক করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়িটি জব্দ করে এবং বনরুটিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণের উদ্দেশ্যে বনরুটিগুলো বহন করা হচ্ছিল। তবে প্যাকেটের গায়ে উল্লেখিত উৎপাদন তারিখ দেখে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কারণ, গাড়ি আটক হওয়ার দিন ছিল ৫ জুন, অথচ অধিকাংশ বনরুটির মোড়কে উৎপাদন তারিখ লেখা ছিল ‘০৬ জুন ২০২৬’। অর্থাৎ পণ্য উৎপাদনের আগেই সেটি বাজারজাত ও পরিবহনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত। তিনি বনরুটির প্যাকেট পরিদর্শন করে অগ্রিম উৎপাদন তারিখ ব্যবহারের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানান।
ইউএনও অর্ণব দত্ত বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বনরুটি ভর্তি একটি গাড়ি পাই। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব বনরুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু প্যাকেটের গায়ে পরদিনের উৎপাদন তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধার হওয়া একটি ক্যাশ মেমোতে প্রায় ২৯ হাজার পিস বনরুটির হিসাব পাওয়া গেছে, যা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সরবরাহের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য ভোক্তার নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উৎপাদন তারিখ জাল, বিভ্রান্তিকর বা অগ্রিম উল্লেখ করা হলে খাদ্যের প্রকৃত মান, সংরক্ষণকাল এবং নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য সরবরাহকৃত খাদ্যে এ ধরনের অনিয়ম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের, দূষিত বা অনিরাপদ বেকারি পণ্য শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, বমি, খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের সংক্রমণ, জ্বরসহ বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের খাদ্য শিশুদের পুষ্টি, শারীরিক বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শিক্ষাজীবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি বিতরণের আগেই বিষয়টি ধরা না পড়ত, তাহলে হাজারো শিক্ষার্থী সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বনরুটিগুলো এখনো কোনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। ফলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় একটি বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার পর সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ গাড়িটি জব্দ করে। চালক ও হেলপারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে। বনরুটি ও গাড়িটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
ইউএনও অর্ণব দত্ত বলেন, “কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত কোনো ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা বা জালিয়াতি বরদাশত করা হবে না। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ঘটনায় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে কঠোর তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রীতে কোনো ধরনের অনিয়ম শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুতর অপরাধ।