
মাওলানা সৈয়দ মাহমুদ মুস্তাফা আল মাদানী (রহ.)-এর প্রশংসাপত্রে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান বিচারক, চিকিৎসক, লেখক ও বহুভাষাবিদ মুফিজুল হক আলী আইয়ুবীর অনন্য অবদান
চট্টগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের জীবন ও কর্ম একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। তেমনই একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন চট্টগ্রামের কৃতীসন্তান, বিচারক, চিকিৎসক, লেখক, পত্রিকা প্রকাশক, সম্পাদক এবং বহুভাষাবিদ জনাব মুফিজুল হক আলী আইয়ুবী (রহ.)। তাঁর বহুমাত্রিক অবদান সম্পর্কে মূল্যবান সাক্ষ্য বহন করে প্রখ্যাত দার্শনিক ও নিখিল পাকিস্তান আদাবী মজলিসের সাহেবে সদর (সভাপতি) মাওলানা আলহাজ্ব সৈয়দ মাহমুদ মুস্তাফা আল মাদানী (রহ.)-এর একটি ঐতিহাসিক প্রশংসাপত্র।
মাওলানা মাদানী (রহ.) তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, ১৩৬৮ হিজরির ৫ সফর থেকে তিনি মুফিজুল হক সাহেবকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন। ফলে তাঁর মূল্যায়ন ছিল দীর্ঘদিনের পরিচয়, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গঠিত। এ কারণেই চিঠিটি কেবল একটি প্রশংসাপত্র নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চিঠিতে মাদানী (রহ.) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মুফিজুল হক সাহেব দীর্ঘকাল ধরে “মজলিসে আদবী”, আরবি ও ফারসি ভাষার বিকাশ, ইসলাম এবং কওমের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, তিনি কেবল একজন বিচারক বা চিকিৎসকই ছিলেন না; বরং ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। আরবি-ফারসি ভাষা ও ইসলামী সাহিত্যচর্চার প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাদানী (রহ.) আরও উল্লেখ করেন, আসামে অবস্থানকালে মুফিজুল হক সাহেব বহু ধর্মীয় ও জাতীয় সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তৎকালীন আসাম ও পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজ যখন শিক্ষা, ভাষা, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামে নিয়োজিত ছিল, তখন তিনি একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজনেতার ভূমিকা পালন করেন।
চিঠির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো তাঁর ধর্মীয় চেতনা সম্পর্কে মন্তব্য। মাদানী (রহ.) লিখেছেন, মুফিজুল হক সাহেব সর্বদা কওম ও ধর্মের উন্নতির কথা চিন্তা করতেন এবং দিনরাত সে লক্ষ্যেই কাজ করে গেছেন। এই মূল্যায়ন তাঁর দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ ও সমাজকল্যাণমুখী জীবনদর্শনের স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজে তাঁর গুরুত্ব আরও বিশেষ কারণ, তিনি আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার এক বিরল সমন্বয়ের প্রতীক ছিলেন। একদিকে বিচারক, চিকিৎসক, লেখক ও ভাষাবিদ হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন; অন্যদিকে ইসলামী আদর্শ, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজসেবার প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত ছিলেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে এ ধরনের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব খুব কমই দেখা যায়। তাই তাঁকে চট্টগ্রামের মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়।
চিঠির শেষাংশে মাওলানা মাদানী (রহ.) মুসলিম সমাজের সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে তাঁরা মুফিজুল হক সাহেবের কল্যাণকর কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। এতে প্রতীয়মান হয়, তাঁর উদ্যোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ছিল না; বরং বৃহত্তর সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের অংশ ছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মাগরিবী পাকিস্তান আদাবী মজলিসের সাহেবে সদর (সভাপতি) হিসেবে জনাব মুফিজুল হক আলী আইয়ুবীকে মনোনীত করতে পেরে মাওলানা মাদানী (রহ.) নিজেও সন্তোষ ও গর্ব প্রকাশ করেছিলেন। এটি তাঁর মর্যাদা, যোগ্যতা ও অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম, সূফী ও জাতীয়তাবাদী নেতা মাওলানা সৈয়দ মাহমুদ মুস্তাফা আল মাদানী (রহ.)-এর মতো একজন ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে এমন উচ্চ প্রশংসা লাভ নিঃসন্দেহে মুফিজুল হক আলী আইয়ুবীর অবদানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এই প্রশংসাপত্র একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন, আদর্শ ও কর্ম নতুনভাবে তুলে ধরা সময়ের দাবি। কারণ, জ্ঞান, সাহিত্য, বিচারবোধ, ধর্মীয় চেতনা এবং সমাজসেবার যে সমন্বিত দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
লেখক ও বিশ্লেষক:
মোহতারম শাহ সূফী মোহাম্মদ সামীউল আলম আফগানী (রহমতুল্লাহ আলাইহি)